Thursday , February 22 2018
Home / বাংলাদেশ / বাঁচার অনেক আকুতিতে ও কিশোরের ডাকে সাড়া দেয়নি কেউ

বাঁচার অনেক আকুতিতে ও কিশোরের ডাকে সাড়া দেয়নি কেউ

 

সময় বেলা আড়াইটা। মানুষের জটলা ব্যস্ত সড়কের আশপাশে। একজন কিশোর আদনানকে ধাওয়া করছেন চার-পাঁচজন যুবক। যুবকদের একজনের হাতে পিস্তল, অন্যজনের হাতে ছুরি। একপর্যায়ে কিশোর আদনান সড়কে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়। প্রথমে যুবকেরা তার মাথায় পিস্তল ঠেকান। এরপর ছুরিকাঘাত করেন পিঠে। রক্তমাখা শরীর নিয়েও দৌড়াতে থাকে বেচারা কিশোর আদনান। কিছুদূর গিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। কিশোরটি বাঁচার আকুতি জানালেও কেউ এগিয়ে আসেনি। খুনি যুবকেরা মিনিট দশেকের মধ্যে এ কাণ্ড ঘটিয়ে চলে যান। এরপর কিশোরকে হাসপাতালে নিতে নিতে নিস্তেজ, ঠান্ডা শরীর। চিকিৎসক বললেন, সে ‘মৃত’।

এ ঘটনা ঘটে গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রাম নগরের জামালখান মোড়ে। ঘটনার বর্ণনা জানা যায় একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর মুখ থেকে। ঘটনাস্থল কোতোয়ালি থানার আওতাধীন। ঘটনাস্থল থেকে মাত্র ৩০০ গজ দূরে নিহত কিশোর আদনান ইসফারের (১৫) বাসা। ঘটনার পরপর হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া যুবকেরা চলে গেলে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসক কিশোর আদনানকে মৃত ঘোষণা করেন।

কিশোর আদনান চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিল। সে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছিল। পরিবারের সবার স্বপ্ন ছিল, সে বাবার মতোই প্রকৌশলী হবে।

কেন, কী কারণে তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে, তা ধারণা করতে পারছেন না স্বজন ও সহপাঠীরা। প্রাথমিকভাবে পুলিশ বলছে, বন্ধুদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জের ধরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। তবে দ্বন্দ্ব কী নিয়ে, তা এখনো স্পষ্ট করে বলতে পারছে না কেউ।

কিশোর আদনান চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির শাহনগর এলাকার আখতার আজমের ছেলে। আখতার আজম খাগড়াছড়িতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত। তবে তাঁরা নগরের জামালখান এলাকায় ‘আম্বিয়া সেরিন’ নামের একটি বহুতল ভবনের ফ্ল্যাটে থাকেন। দুই ভাইবোনের মধ্যে আদনান ছোট।

ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে খাগড়াছড়ি থেকে রাত সাড়ে আটটায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছুটে আসেন বাবা আখতার আজম। তখনো হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনের লাশঘরে রাখা ছিল আদনানের মৃতদেহ। ছেলের লাশ দেখে বাক্‌রুদ্ধ হয়ে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে ডুকরে কেঁদে ওঠেন। এ সময় স্বজনেরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। বুক চাপড়ে বলতে থাকেন, ‘কীভাবে চলে গেলি বাবা। আমি কী নিয়ে বাঁচব।’

বিকেল থেকেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে কিশোর আদনানের স্বজনেরা ভিড় করছিলেন। সেখানে কাঁদতে কাঁদতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আদনানের ফুফু গুলজার আক্তার। তিনি বলেন, ‘আমার ভাইয়ের একটা মাত্র ছেলেকে মেরে ফেলল। ভাইরে কে দেখবে।’

কেন স্কুল পড়ুয়া ছেলেকে খুন করা হলো, তার হিসাব মেলাতে পারছেন না স্বজনেরা। নিহত আদনানের খালু মাহাবুবুল আলম বলেন, কারও সঙ্গে কিশোর আদনানের পরিবারের বিরোধ নেই। সে কোনো রাজনীতিতে জড়িত না। পড়াশোনার পাশাপাশি ক্রিকেট খেলত। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কোনো বিরোধে এ ঘটনা ঘটেছে কি না, তাঁরা জানেন না। একই কথা জানালেন কিশোর আদনানের খালাতো ভাই জাবেদ ওমরও।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আইডিয়াল স্কুলের চার ছাত্র হাসপাতালে এসে কান্নায় ভেঙে পড়ে। তারা জানায়, স্কুল ছুটির পর তারা বের হয়ে রাস্তায় দাঁড়ায়। রাস্তার বিপরীত দিকে দেখতে পায় কিশোর আদনানকে চার-পাঁচজন যুবক ধাওয়া করছেন। তাঁদের হাতে পিস্তল ও ছুরি ছিল। একপর্যায়ে তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। একজন কিশোর আদনানের মাথায় পিস্তলও ঠেকান। ছুরিকাঘাতের পরও সে আইডিয়াল স্কুলের সামনে থেকে ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে চলে আসে। সেখানেই লুটিয়ে পড়ে। যুবকেরা চেরাগী মোড়ের দিকে চলে যান। সে চিৎকার করলেও কেউ তার সাহায্যে এগিয়ে আসেনি।

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) এস এম মোস্তাইন হোসেন বলেন, ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরার ভিডিওচিত্র দেখে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। কী কারণে এই খুন, তা তদন্ত করা হচ্ছে। মামলার প্রস্তুতি চলছে।

কিশোর আদনানের লাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লাশঘরে রয়েছে। আজ বুধবার হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *