Friday , January 19 2018
Home / বাংলাদেশ / কোনো ভাবেই কান্না থামছে না রোহিঙ্গা শিশুটির ! কি হয়েছে শিশুটির ?

কোনো ভাবেই কান্না থামছে না রোহিঙ্গা শিশুটির ! কি হয়েছে শিশুটির ?

বৃহস্পতিবার (২১ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪ টা ৩০ মিনিট। কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের পাহাড়ি পথ ধরে এগোচ্ছিলাম। প্রায় ৪৫ মিনিট হাঁটার পর কানে এলো এক শিশুর কান্না। শিশুটি অনেক জোরে কাঁদছিলো। ডান পাশের তাঁবুর ভেতরে ঢুকে দেখা গেলো এক অমানবিক দৃশ্য।
মায়ের কোলে শিশু জিসনা। কিছুক্ষণ কান্নার পর যেন আর পারছিলো না। খুব হাঁফিয়ে উঠছিলো। শুকনো মুখ। ক্ষুধার্ত চেহারা। মায়ের মলিন অবয়ব। শিশুর কান্না থামানোর কোনও শক্তিই তার নেই। কোনো সামর্থ্যই তার নেই। কান্নার শক্তিটুকু যখন হারিয়ে যায়, তখন আপনাআপনিই বন্ধ হয়ে যায় মুখ। কেবল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে চোখের জল।
প্রথম দেখে মনে হচ্ছিলো বয়স চার থেকে পাঁচ মাস। নূর বেগম যখন জানালেন তার ছেলে এক বছর পার করেছে কিছুদিন আগে, আরও কাছে গিয়ে আরেকবার দেখলাম। জিসনার শরীরে কোনো মাংস নেই। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে বুকের হাড়গোড়। পিঠের হাড়ও যেন ওপর থেকে দেখা যায়। হাত দুটো ঘাড়ের মধ্যে যেন ঝুলে রয়েছে।
কুতুপালংয়ের পাহাড়চূড়ায় জিসনাদের থাকার কথা ছিলো না। থাকতে বাধ্য হচ্ছে তারা। নাফ নদীর ওপারের ভয়ংকর নৃশংসতা তাদের ঠেলে দিয়েছে এপারে। দিন দশেক আগে মায়ের কোলে চড়ে বাংলাদেশের সীমানায় প্রবেশ করে শিশুটি। ওপারে রেখে এসেছে পিতার লাশ। তার পিতা মোহাম্মদ জিন্নাহকে জবাই করে খুন করেছে মিয়ানমারের সৈন্যরা।
জিসনার জীবন বাঁচাতে নূর বেগম সেই রাতেই ছুটে চলেন পাহাড়ি জঙ্গলের দিকে। সঙ্গে পান আরও কয়েকজন রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ। সঙ্গে ছিলো না কিছুই। না এক টুকরো শুকনো খাবার, না একটি কানাকড়ি। সঙ্গে থাকা অন্য মানুষেরা প্রথম দুদিন তাকে কিছু খাবার দিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন। নিজে না খেয়ে অল্প অল্প করে খাইয়েছেন কোলে থাকা জিসনাকে। এরপর মা-ছেলের আটটি দিন কেটেছে অনাহারে।
 
একদিন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এপারে আসতে পারেন নূর বেগম। ঠাঁই হয় কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের সীমানার বাইরে একটি পাহাড়ের চূড়ায়। সেই থেকে এই পাহাড়ে আছেন তারা। কিন্তু জীবন চলছে অনাহারে কিংবা অর্ধাহারে।
শিশুটি এখন আর মায়ের দুধ খেতে চায় না। চাইবেই বা কি করে। দুধ তো ঠিকমতো পাচ্ছেও না।
কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কে উখিয়া বাজার পার হলেই দুই ধারে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুর ভিড় দেখা যায়। একটি ত্রাণের প্যাকেট অথবা সামান্য কটা টাকার জন্যে তাদের দিনভর প্রতীক্ষা। নূর বেগম সেই ভিড়ে নেই। এইটুকু ছেলেকে নিয়ে থাকবেনই বা কি করে! সড়ক থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার ভেতরে পাহাড় থেকে পাহাড় হয়ে নূর বেগমের তাঁবুর নিচে যে কজন দরদি একটুখানি খাবার পৌঁছে দেয়, সেটিই তাদের বেঁচে থাকার সম্বল।
দীর্ঘক্ষণ কথা বলছিলাম নূর বেগমের সঙ্গে। নাফ নদীর ওপারে মংডু জেলার নাকপুরায় তাদের বাড়ি ছিলো। চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন তার স্বামী। তাতে তাদের জীবন চলে যাচ্ছিলো। হঠাৎ নেমে আসা মৃত্যুর বিভীষিকা অন্ধকার করে দেয় নূর বেগম আর জিসনার জীবন।
সামনের দিনগুলি কি করে কাটবে জানেন না নূর বেগম। বুঝতে পারছেন না অবুঝ শিশুটির মুখে কি করে এক মুঠো খাবার তুলে দেবেন রোজ। নিজে না খেয়ে থাকার কষ্ট না হয় সয়ে যাবেন। কি করে সইবেন কোলের শিশুটির অভুক্ত আর্তনাদের যন্ত্রণা!
ক্ষণে ক্ষণে কেঁদে উঠছিলো জিসনা। শিশুটির ভেতরটা তখন কেমন করছিলো বোঝা মুশকিল। ওপর থেকে অপলক তাকিয়ে ঠিকই মনে হয়েছে, ওর ভেতরটা হাহাকার করছিলো। ভালোমন্দ কিছু হয়তো খেতে চাইছে। কথা যে বলতে পারে না। খাবার তো চাইতে পারে না। এই কান্নাই ওর মনের ভাষা। এই আর্তনাদই ওর ক্ষুধার জ্বালা বুঝিয়ে দেয়। বুকে টেনে নিয়ে ছেলের কান্না থামাবার প্রাণান্ত চেষ্টা করে যান নূর। বুকের ভেতরে গুঁজে ধরে এখান থেকে ওখানে হাঁটেন। ছেলেটিকে ঘুম পাড়াবার চেষ্টা করেন। কয়েক সেকেন্ড ওর কান্না থামে। আবার শুরু হয়। ওর ক্ষুধা তো ঘুমের নয়, খাবারের।

Check Also

বেবী নাজনীন সংসদ নির্বাচন করতে চান

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটে দাঁড়াতে চান জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *