Wednesday , March 28 2018
Home / জাতীয় / সিনেমার গল্পও হার মানবে এই মোর্শেদা খাতুনের জীবনের কাছে

সিনেমার গল্পও হার মানবে এই মোর্শেদা খাতুনের জীবনের কাছে

ভাগ্যর নির্মম পরিহাস কখন যে কাকে কোথায় নিয়ে যায়,তা কেউ বলতে পারে না। তবুও জীবন চলে যায় বহমান নদীর মত।
ভাসতেই মানুষ কোনো না কোন গন্তব্যে পৌঁছে যায়। আর এই গন্তব্য কারো জন্য হয় সুখের, আবার কারো জন্য দুঃখের। এমনি এক দুঃখিনীর নাম মোর্শেদা খাতুন।

যে কোন সিনেমার গল্পকেও হার মানাবে মোর্শেদা খাতুনের বাস্তব জীবনের গল্প! প্রায় দশ বছর আগে জামালপুর থেকে নিজের অজান্তেই চলে যান কলকাতায়, স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। একটি বেসরকারী সেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫বছরের চেষ্টায় এখন সুস্থ মোর্শেদা খাতুন। কিন্তু হারিয়ে ফেলেছেন আপন আত্নীয়স্বজনদের। প্রশাসনিক জটিলতার কারণে ফিরতে পারছেন না নিজের গ্রামে । মোর্শেদার সেই আর্তির এক্সক্লুসিভ ভিডিও এসেছে সময় টেলিভিশনের কাছে।

 
প্রায় দশ বছর আগের কথা।বাংলাদেশের জামালপুর জেলার মালনদাহ উপজেলার পশ্চিম ব্রাম্মনপাড়ার বাসিন্দা নমাজ উদ্দিন নন্দা মিয়ার মেয়ে । পাশের গ্রাম গোজামানিকা গ্রামের বাসিন্দা হাবিবুর শেখের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছিল তার, সেই স্বামীর ঘরেই মোর্শেদা খাতুন- দুই মেয়ে এবং এক ছেলে সন্তানের জননী হন। কিন্তু মোটেই বনিবনা হচ্ছিল না স্বামীর সাথে মোর্শেদা খাতুনের। স্বামীর অত্যাচার আর অবহেলায় দিন দিন মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ছিলেন তিনি। স্বামী অত্যাচার সইতে না পেরে মোর্শেদাও চাচ্ছিলেন এমন সম্পর্কের অবসান। এক সময় তার স্বামী তাকে ফেলে রেখে চলে যায় কোন এক রেল স্টেশনে, মোর্শেদার ভাসা ভাসা ব্যাখায় ধারণা করা হচ্ছে সেই রেলস্টেশনটি ছিল জামালপুরে। তারপর কিভাবে কিভাবে যেন চলেন গেলেন ভারতের মুর্শিদাবাদ। আর সেখানেই স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি। তার চিকিৎসকের ভাস্যমতে প্রচন্ড মানসিক যন্ত্রনায় তিনি বিস্মৃতি হয়েছিলেন সবকিছু।
 
মোর্শেদার বয়স এখন প্রায় ৪০ বছর। ২০১৩ সালে বর্ধমান শহর এলাকায় মোর্শেদা খাতুনকে ঘোরাঘুরি করতে দেখে স্থানীয় পুলিশ উদ্ধার করে। কিন্তু পুলিশ টের পায় সে মানসিক রোগী। তারপর চিকিৎসার জন্য পুলিশ তাকে পাঠিয়ে দেয় বহরমপুর মানসিক হাসপাতালে। পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গের একটি বেসরকারি সেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘অঞ্জলী’ তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়।। প্রায় পাঁচ বছরের চিকিৎসায় হারানো স্মৃতি অনেকটাই ফিরে পান মোর্শেদা বেগম। ডাক্তারি চিকিৎসা ছাড়াও মোর্শেদাকে সেখানে দেওয়া হচ্ছিল মিউজিক থেরাপি এবং যোগার মতো ভিন্নমাধ্যমের চিকিৎসা সেবা।
 
সেচ্ছাসেবী সংস্থার হয়ে মোর্শেদাকে ‘মিউজিক থেরাপি’ দেওয়ার কাজটি করছিলেন স্বাতীলেখা ধরগুপ্ত । সেই বিশেষজ্ঞ স্বাতীলেখা ধরগুপ্ত মোর্শেদার কাছ থেকে বাংলাদেশের তার গ্রামের বাড়ির ঠিকানা সংগ্রহ করেন এবং নিজ উদ্যোগে তার এক আত্নীয়ের সাহায্যে মোর্শেদার বাবা-মা কে খুঁজে পান। এই কাজে জামালপুরের একজন সিনিয়র সাংবাদিক তাকে সাহায্য করেন। এর মধ্যে মোর্শেদা তার বাবা-মায়ের সঙ্গে টেলিফোনে প্রায় দুইবার কথাও বলেছেন।
মোর্শেদা এখনো পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের বহরমপুর মানসিক হাসপাতালে আছেন এবং নাগরিকত্বের প্রমানের অভাবে ফিরতে পারছেন না নিজের দেশে। তিনি এখন ফিরতে চান আপন গ্রামে;তার পরিবারের কাছে। কাছে পেতে চান তার দুই মেয়ে ও ছেলেকে। কিন্তু তিনি জানেন না তার ছেলেমেয়েরা কে কোথায় আছে।
 
মোর্শেদা খাতুন জানিয়েছেন, তার ছেলে-মেয়ের কথা মনে পড়ে। বাবা-মায়ের কথা মনে পড়ে। মনে পড়লে কষ্ট হয়, কান্না করেন। তার বোনদের কথাও মনে পড়ে।
চিকিৎসায় সে এখন অনেকটাই সুস্থ। ভিন দেশে আর এক মুহুর্ত থাকতে চান না মোর্শেদা। জামালপুরে নিজের গ্রামে গিয়ে দুই মেয়ে আর এক ছেলে নিয়ে সুখে-শান্তিতে বেঁচে থাকতে চান।
এ ব্যাপারের যোগাযোগ করা হলে বহরমপুর মানসিক হাসপাতালের সুপার প্রশান্ত চৌধুরী টেলিফোনে জানিয়েছেন, মোর্শেদা এখন অনেকটাই সুস্থ। তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
মোর্শেদার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে বেসরকারি সংস্থা অঞ্জলীও উদ্যোগী হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তা অদিতি বাসু ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *